রমজান ও রোজা: প্রচলিত দুর্বল ও জাল বর্ণনাসচেতনতামূলক তালিকা · ১৮টি বর্ণনা — প্রতিটির মান ক্লাসিক্যাল হাদিস-বিশেষজ্ঞের বক্তব্য থেকে হুবহু উদ্ধৃত
⚠️ সতর্কতা: নিচের কথাগুলো নবীজি (সা.)-এর বাণী হিসেবে প্রচার করবেন না। এই তালিকা দেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ চিনতে পারে — প্রচারের জন্য নয়।
প্রতিটি রায় মূল আরবি কিতাব থেকে হুবহু নেওয়া (OpenITI ডিজিটাল পাঠ): ইমাম শাওকানির আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ ফিল আহাদিসিল মাওযূআ , ইবনে আবি হাতিমের ইলালুল হাদিস ও সহিহ ইবনে খুযাইমা । কিছু হাদিসের মান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন। যে বর্ণনার রায় মূল উৎসে যাচাই করা যায়নি, তা এখানে রাখা হয়নি।
রমজানের ফজিলতে অসংখ্য সহিহ হাদিস আছে — যেমন “যে ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করা হয়” (সহিহ বুখারি ৩৮, সহিহ মুসলিম ৭৬০)। হাদিস সংকলন দেখুন →
১ মুনকার (অগ্রহণযোগ্য)
أيها الناس قد أظلكم شهر عظيم ... وهو شهر أوله رحمة وأوسطه مغفرة وآخره عتق من النار
“হে লোকসকল, এক মহান মাস তোমাদের ওপর ছায়া ফেলেছে… এ মাসের প্রথম অংশ রহমত, মধ্য অংশ মাগফিরাত আর শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি।”
قال أبو حاتم: «هذا حديث منكر» — وبوّب عليه ابن خزيمة: «باب فضائل شهر رمضان إن صح الخبر»
🔎 ইমাম আবু হাতিম রাযি একে «মুনকার হাদিস» বলেছেন। ইবনে খুযাইমা বর্ণনা করলেও অধ্যায়ের শিরোনামে শর্ত দিয়েছেন: «যদি বর্ণনাটি সহিহ হয়»। সনদে আলি ইবনে যায়দ ইবনে জুদআন আছেন।
সূত্র: ইলালুল হাদিস (ইবনে আবি হাতিম) নং ৭৩৩; সহিহ ইবনে খুযাইমা নং ১৮৮৭
২ নবীজির (সা.) বাণী হিসেবে ভুল
لا تقولوا رمضان فإن رمضان اسم من أسماء الله تعالى ولكن قولوا شهر رمضان
““রমজান” বলো না, কারণ রমজান আল্লাহর নামসমূহের একটি; বরং বলো “রমজান মাস”।”
قال أبو حاتم: «هذا خطأ، إنما هو قول أبي هريرة»
🔎 আবু হাতিম বলেছেন: নবীজির (সা.) নামে বর্ণনা করা ভুল; এটি আবু হুরায়রা (রা.)-এর নিজের কথা হিসেবে বর্ণিত। (শাওকানিও তালিকাভুক্ত করেছেন, সনদে মুহাম্মাদ ইবনে আবি মা'শার।)
সূত্র: ইলালুল হাদিস নং ৭৩৪; আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ২
৩ মাওযু (জাল)
إذا كان أول ليلة من شهر رمضان نادى الجليل رضوان خازن الجنان ...
“রমজানের প্রথম রাতে মহান আল্লাহ জান্নাতের রক্ষী রিদওয়ানকে ডাকেন… (দীর্ঘ বর্ণনা)”
وهو موضوع وفي إسناده أصرم بن حوشب كذاب
🔎 জাল; সনদে আসরাম ইবনে হাওশাব — মিথ্যাবাদী।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ (শাওকানি), কিতাবুস সিয়াম নং ৪
৪ মাওযু (জাল)
لو علم العباد ما في رمضان لتمنت أمتي أن يكون رمضان السنة كلها
“বান্দারা যদি জানত রমজানে কী আছে, তবে আমার উম্মত কামনা করত যেন পুরো বছরই রমজান হয়।”
رواه أبو يعلى عن ابن مسعود مرفوعا وهو موضوع آفته جرير بن أيوب
🔎 জাল; সমস্যার মূল বর্ণনাকারী জারির ইবনে আইয়ুব।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ৫
৫ মাওযু (জাল)
إذا كان أول ليلة من شهر رمضان نظر الله إلى خلقه الصيام وإذا نظر الله إلى عبد لم يعذبه ...
“রমজানের প্রথম রাতে আল্লাহ রোজাদার সৃষ্টির দিকে তাকান, আর যার দিকে তাকান তাকে কখনো শাস্তি দেন না…”
موضوع وفيه مجاهيل، والمتهم بوضعه عثمان بن عبد الله القرشي
🔎 জাল; সনদে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী, জাল করার অভিযোগ উসমান ইবনে আবদুল্লাহ কুরাশির ওপর।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ৬
৬ মাওযু (জাল)
إن الله تبارك وتعالى ليس بتارك أحدا من المسلمين صبيحة أول يوم من شهر رمضان إلا غفر له
“রমজানের প্রথম দিনের সকালে আল্লাহ কোনো মুসলমানকেই ক্ষমা না করে ছাড়েন না।”
رواه الخطيب عن أنس مرفوعا ولا يصح وفي إسناده كذاب ومتروك
🔎 সহিহ নয়; সনদে একজন মিথ্যাবাদী ও একজন পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ৭
৭ বাতিল / ভিত্তিহীন
إن الله تبارك وتعالى في كل ليلة من رمضان عند الإفطار ألف ألف عتيق من النار
“রমজানের প্রতি রাতে ইফতারের সময় আল্লাহ দশ লক্ষ জনকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন।”
روي عن ابن عباس مرفوعا وهو لا يثبت عنه، ورواه ابن حبان من حديث أنس بلفظ ستمائة ألف وقال: باطل لا أصل له
🔎 ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে প্রমাণিত নয়; “ছয় লক্ষ” শব্দে বর্ণনাটিকে ইবনে হিব্বান বলেছেন: «বাতিল, এর কোনো ভিত্তি নেই»।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ৮
৮ দুর্বল (যঈফ)
لو أذن الله لأهل السماوات والأرض أن يتكلموا لبشروا صوام شهر رمضان بالجنة
“আল্লাহ যদি আসমান-জমিনবাসীকে কথা বলার অনুমতি দিতেন, তারা রমজানের রোজাদারদের জান্নাতের সুসংবাদ দিত।”
رواه العقيلي عن أنس مرفوعا وقال: إسناده مجهول وحديث غير محفوظ
🔎 উকাইলি বলেছেন: সনদ অজ্ঞাত, হাদিসটি সংরক্ষিত (মাহফুজ) নয়।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ৯
৯ দুর্বল (যঈফ)
صوموا تصحوا
“রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে।”
قال الصغاني: موضوع، وقال في المختصر: ضعيف
🔎 সাগানি একে জাল বলেছেন, “আল-মুখতাসার”-এ দুর্বল বলা হয়েছে — অর্থাৎ অন্তত দুর্বল; নবীজির (সা.) নামে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ১০
১০ দুর্বল (যঈফ)
لكل شيء زكاة وزكاة الجسد الصوم
“প্রত্যেক জিনিসের যাকাত আছে, আর শরীরের যাকাত হলো রোজা।”
قال في الخلاصة: ضعيف
🔎 দুর্বল।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ১১
১১ মাওযু (জাল)
إنما سمي رمضان لأنه يرمض الذنوب ...
“রমজানকে রমজান বলা হয় কারণ এটি গুনাহ পুড়িয়ে দেয়… (তিনটি রাতের বিশেষ ফজিলতসহ)”
قال في الذيل: في إسناده زياد بن ميمون كذاب
🔎 সনদে যিয়াদ ইবনে মাইমুন — মিথ্যাবাদী।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ১৫
১২ মাওযু (জাল)
إذا سلمت الجمعة سلمت الأيام وإذا سلم رمضان سلمت السنة
“জুমা নিরাপদ থাকলে সপ্তাহ নিরাপদ, আর রমজান নিরাপদ থাকলে পুরো বছর নিরাপদ।”
رواه الدارقطني عن عائشة مرفوعا وفي إسناده عبد العزيز بن أبان وهو كذاب
🔎 সনদে আবদুল আযিয ইবনে আবান — মিথ্যাবাদী।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ২১
১৩ মাওযু (জাল)
من أفطر على تمرة من حلال زيد في صلاته أربعمائة صلاة
“যে হালাল একটি খেজুর দিয়ে ইফতার করে, তার নামাজে চারশো নামাজ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।”
وفي إسناده موسى الطويل وكان يضع
🔎 সনদে মুসা আত-তাওয়িল — যিনি হাদিস জাল করতেন।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ২২
১৪ মাওযু (জাল)
خمس يفطرن الصائم وينقضن الوضوء: الكذب والنميمة والغيبة والنظر لشهوة واليمين الكاذبة
“পাঁচটি জিনিস রোজা ভেঙে দেয় ও অজু নষ্ট করে: মিথ্যা, চোগলখোরি, গিবত, কামনাসহ দৃষ্টি ও মিথ্যা কসম।”
قال في اللآلئ: موضوع، بسعيد يعني ابن عنبسة كذاب
🔎 জাল; সনদে সাঈদ ইবনে আনবাসা — মিথ্যাবাদী। (গিবত-মিথ্যা রোজার সওয়াব নষ্ট করে — এটি সহিহ হাদিসে আছে; কিন্তু “রোজা ও অজু ভেঙে যায়” কথাটি জাল।)
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ২৫
১৫ মাওযু (জাল)
من أفطر يوما من رمضان فليهد بدنة ...
“যে রমজানের একটি রোজা ভাঙে সে যেন একটি উট কুরবানি করে…”
رواه الدارقطني عن جابر مرفوعا وفي إسناده مقاتل بن سليمان كذاب
🔎 সনদে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান — মিথ্যাবাদী।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ২৬
১৬ দুর্বল (যঈফ)
من أفطر يوما من رمضان من غير رخصة ولا عذر كان عليه أن يصوم ثلاثين يوما ...
“যে বিনা কারণে রমজানের একটি রোজা ভাঙে তাকে ত্রিশ দিন রোজা রাখতে হবে…”
رواه الدارقطني عن أنس مرفوعا وقال: لا يثبت
🔎 স্বয়ং ইমাম দারাকুতনি বলেছেন: «প্রমাণিত নয়»।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সিয়াম নং ২৭
১৭ মাওযু (জাল)
من صلى في آخر جمعة من رمضان الخمس الصلوات المفروضة في اليوم والليلة قضت عنه ما أخل به من صلاة سنته
“যে রমজানের শেষ জুমায় দিন-রাতের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়ে, তার সারা বছরের ছুটে যাওয়া নামাজ আদায় হয়ে যায় (তথাকথিত “কাজায়ে উমরি”)।”
هذا موضوع لا إشكال فيه
🔎 শাওকানি: «নিঃসন্দেহে জাল»। ছুটে যাওয়া নামাজ প্রত্যেকটি আলাদাভাবে কাজা করতে হয়।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সালাত নং ১১৫
১৮ মাওযু (জাল)
من صلى ليلة الفطر مائة ركعة ...
“যে ঈদুল ফিতরের রাতে একশো রাকাত নামাজ পড়ে (নির্দিষ্ট সূরা ও তাসবিহসহ)…”
هو موضوع ورواته مجاهيل
🔎 জাল; বর্ণনাকারীরা অজ্ঞাত।
সূত্র: আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআ, কিতাবুস সালাত নং ১০৭